দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে নওগাঁ শহরের দেয়ালজুড়ে আঁকা হয়েছিল শতাধিক গ্রাফিতি ও ম্যুরাল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা, শহীদদের আত্মত্যাগ, সম্প্রীতির বাংলাদেশ এবং নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন রঙ-তুলির আঁচড়ে স্থান পেয়েছিল এসব দেয়ালচিত্রে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর না পেরোতেই সেই শিল্পকর্মগুলোর বড় একটি অংশ হারিয়ে যেতে বসেছে।
কোথাও বৃষ্টি-রোদে রং বিবর্ণ হয়েছে, কোথাও দেয়ালে নতুন রংয়ের প্রলেপ পড়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক পোস্টার ও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের আড়ালে চাপা পড়েছে আন্দোলনের স্মৃতি। সংস্কারকাজের সময়ও মুছে গেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিতি। সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না থাকায় ইতিহাসের এই শিল্পভাষা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা, কেডির মোড়, নওগাঁ সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উপজেলা সদরগুলোতে হাজার হাজার গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। অধিকাংশ দেয়ালে স্থান পেয়েছিল রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের প্রতিকৃতি। পাশাপাশি লেখা হয়েছিল-‘সবাই মিলে গড়বো দেশ, চলরে নওজোয়ান শোনাও পাতিয়া কান...’, ‘দেশটা কারোর বাপের না’, ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়’, ‘৩৬শে জুলাই’, ‘বিকল্প কে? আমি, তুমি, আমরা’, ‘বিকল্প কে? ছাত্র’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘এবার সভ্যতা আনব’, ‘স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো’, ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’ এবং ‘নতুন স্বাধীনতা ২০২৪’-এর মতো অসংখ্য স্লোগান। এসব দেয়ালচিত্র আন্দোলনের ইতিহাসকে শিল্পের ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের অনেক দেয়ালচিত্রের রং প্রায় মুছে গেছে। কোথাও পুরো দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে, কোথাও বিজ্ঞাপন ও পোস্টারে ঢেকে গেছে শিল্পকর্ম। আবার কিছু স্থানে ভবন ও দেয়াল সংস্কারের সময় সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে গ্রাফিতি। ফলে একসময় মানুষের দৃষ্টি কাড়া এসব দেয়ালচিত্র এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
নওগাঁ শহরের কেডির মোড় এলাকায় সেসময় গ্রাফিতি অঙ্কনকারী নওগাঁ বিএমসি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী দিপিকা বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তিগত স্বীকৃতির জন্য নয়, একটি ঐতিহাসিক সময়কে রঙ-তুলির মাধ্যমে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে গ্রাফিতি এঁকেছিলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো মুছে যেতে দেখে কষ্ট লাগে। এগুলো সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, সেই সময়ে মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা কী ছিল।”
রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাবরিনা সূচি বলেন, “গ্রাফিতিগুলো শুধু শিল্পকর্ম নয়, এগুলো আমাদের সময়ের দলিল। ইতিহাস শুধু বইয়ে লেখা থাকে না, দেয়ালেও লেখা থাকে। এসব দেয়ালচিত্র নষ্ট হয়ে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতিও হারিয়ে যাবে।”
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মনিরা শারমিন বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও চেতনা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। তাই গ্রাফিতির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে জুলাইয়ের আকাঙ্খা ও ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে রাখা জরুরি। দেওয়ালে লেখা এই বার্তাগুলো মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে-কেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল এবং সেই আন্দোলনের লক্ষ-উদ্দেশ্য কী ছিল।”
তিনি বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর বৈধতার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক রাজনীতিক আজ যে অবস্থানে আছেন, তা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছাড়া সম্ভব হতো না। তাই জুলাইকে কোনোভাবেই বিস্মৃত হতে দেওয়া যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু সরকারের নয়, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই জুলাইয়ের চেতনা সংর¶ণ করতে হবে। গ্রাফিতি তরুণদের সম্পৃক্ত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এগুলো সংরক্ষণ করা গেলে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকবে।”
শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও ইতিহাস-গবেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতিগুলো কেবল দেয়ালচিত্র নয়; এগুলো একটি ঐতিহাসিক সময়ের সাংস্কৃতিক দলিল। গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিতিগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষণ, উচ্চমানের আলোকচিত্র ধারণ, শিল্পীর পরিচয় ও অঙ্কনের সময় নথিভুক্ত করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উন্নয়ন বা সংস্কারকাজের সময় গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালচিত্র সংর¶ণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই দৃশ্যমান ইতিহাসের বড় অংশ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কে